নিজস্ব প্রতিবেদক: ওরা জানে-ইচ্ছা, চেষ্টা আর সাধনা থাকলে জীবনে সফলতা আসতে খুব বেশি সময় লাগে না| এটি প্রমাণও করেছে ওরা| মাত্র এক মাসের গবেষণায় সাফল্যের দেখা মিলেছে তাদের| ওরা এখন নয়া উদ্ভাবক| ওরা আবিস্কার করেছে এমন একটি কলা যা উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাদ অপরিবর্তিত রেখে কলাকে অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ করা যাবে| এটি অপুষ্টি দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে|
ওরা কুরতুবী আলিম মাদরাসার প্রথম বর্ষের ছাত্রী ফাতেমাতুজ জহুরা, অনামিকা আলফি আমরি, মিফতাহুল জান্নাত মায়া, মেঘলা আক্তার ও ফারজানা আক্তার| উদ্ভাবক দলের দলনেত্রী ফাতেমাতুজ জহুরা জানান, এই প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য হলো কলার ডিএনএ নিষ্কাশন করা এবং রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রোটিন সমৃদ্ধ কলার একটি মডেল ˆতরি করা| এ প্রজেক্টে মুসুর ডাল থেকে ডিএইচডিপিএস জিন নির্বাচন করা হয়েছে, যা লাইসিন সমৃদ্ধ প্রোটিন উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ|
লাইসিন একটি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড যা মানবদেহের বৃদ্ধি, টিস্যু গঠন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন ˆজবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| সাধারণ কলায় লাইসিনের পরিমাণ কম থাকায় জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এর পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হয়েছে| টাঙ্গাইল শহরের সাবালিয়া কুরতুবী মাদরাসার প্রধান কার্যালয়ে কথা হয় নয়া উদ্ভাবক দলের প্রতিনিধিদের সাথে| তারা জানান আবিস্কারের বিস্তারিত তথ্য| চলতি বছরের মার্চ মাসে তারা জীববিজ্ঞান ল্যাব ক্লাসে ডিএনএ প্রযুক্তি নিয়ে তারা কাজ করছিলেন| এ সময় হঠাৎ করেই তাদের মাথায় আসে নতুন প্রযুক্তি আবিস্কারের ধারণা| কোন চিন্তা-ভাবনা না করে শুরু করে দেন গবেষণা| তাদের গাইড শিক্ষক আরিফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চলতে থাকে গবেষণা| প্রবল আগ্রহ, কঠোর সাধনা শুরু হয়| তাদের সময়ের বড় অংশ কাটতে থাকে ল্যাবে-গবেষণার কাজে| মাত্র এক মাসের মাথায়ই তারা সাফল্যের দেখা পান| উদ্ভাবন করেন স্বাদ অপরিবর্তিত রেখে কলাকে অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ করা সম্ভব| তারা এ প্রজেক্টের নাম দেয়, ‘ প্রোটিন সমৃদ্ধ কলা ˆতরির জন্য কলার ডিএনএ নিষ্কাশন ও রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ মডেল’|
এদিকে চলতি বছরের ৮ ও ৯ এপ্রিল টাঙ্গাইলে আয়োজন করা হয় সদর উপজেলা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা| সেখানে উপজেলা পর্যায়ে কুরতুবী আলিম মাদরাসার ছাত্রী এই নয়া উদ্ভাবন প্রথম স্থান অর্জন করে| একই মাসের ১৬,১৭ ও ১৮ এপ্রিল জেলা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা| সেখানেও এটি প্রথম স্থান অর্জন করে| তারপর বিভাগীয় পর্যায়ে গিয়ে দ্বিতীয় হয়ে অংশগ্রহণ করে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায়| জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হতে না পারলেও বিচারকসহ আমন্ত্রিত অতিথিদের ভুয়ষী প্রশংসিত হয়েছে ছাত্রী এ আবিস্কার|
ছাত্রীরা জানান, কলা পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ফল| এটি শক্তি, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের ভালো উৎস হলেও এতে কিছু অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড, বিশেষ করে লাইসিনের পরিমাণ কম থাকে|
আধুনিক ˆজবপ্রযুক্তি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ফসলের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করা সম্ভব| রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক জীবের উপকারী জিন অন্য জীবের মধ্যে প্রবেশ করানো যায়| এই প্রজেক্টে কলার ডিএনএ নিষ্কাশনের পাশাপাশি মুসুর ডালের ডিএইচডিপিএস জিন কলার মধ্যে সংযুক্ত করার একটি তাত্ত্বিক মডেল ˆতরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে লাইসিন সমৃদ্ধ ও অধিক পুষ্টিকর কলা উৎপাদনের ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে|
প্রজেক্টের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ছাত্রীরা জানান, কলার ডিএনএ নিষ্কাশন করা, রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা, মুসুর ডালের ডিএইচডিপিএস জিন কলার ডিএনএ-তে সংযুক্ত করার মডেল ˆতরি করা, লাইসিন সমৃদ্ধ ও প্রোটিনযুক্ত কলা উৎপাদনের ধারণা প্রদান করা, কলার স্বাদ ও গুণগত মান অপরিবর্তিত রাখা, অপুষ্টি দূরীকরণে ˆজবপ্রযুক্তির ভূমিকা তুলে ধরা এবং কৃষি ও অর্থনীতিতে জেনেটিক পরিবর্তিত ফসলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা|
এ প্রযুক্তি আবিস্কারের জন্য তারা কিছু উপকরণ বেছে নিয়েছেন| তারা মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, পাকা কলা, লবণ, গরম পানি, ডিশ ওয়াশিং লিকুইড, ব্লেন্ডার/চামচ, কফি ফিল্টার বা পাতলা কাপড়, টেস্ট টিউব/গ্লাস, ঠান্ডা অ্যালকোহল বা ইথানল এবং কাঠি বা টুথপিক|
আবিস্কৃত প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে ছাত্রীরা জানান, বাণিজ্যিকভাবে প্রোটিন সমৃদ্ধ কলা উৎপাদন, অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ ফসল ˆতরি, বৃহৎ পরিসরে গবেষণা ও চাষাবাদ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ˆজবপ্রযুক্তি গবেষণায় অংশগ্রহণ| তবে এজন্য তাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে| এজন্য তাদের উন্নত ল্যাব সুবিধা প্রয়োজন| জেনেটিক পরিবর্তিত খাদ্য নিয়ে সামাজিক ও ˆনতিক বিতর্ক থাকতে পারে| বাণিজ্যিক ব্যবহারের আগে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন বলে তারা উল্লেখ করেন|
কুরতুবী আলিম মাদরাসার শিক্ষক আরিফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ অনেক বেশি| ওদের একটু ধারণা দেয়া হলে ওরা ভালো কিছু করতে পারবে| ছাত্রীরা দেখিয়েছে, জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে কিভাবে অত্যাবশকীয় এমাইনো এসিড সমৃদ্ধ প্রোটিন উৎপাদন করা যায়|
কুরতুবী আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞানমনস্ক, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি| ভবিষ্যতেও বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে যাতে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় দেশ ও জাতির কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে|’
কুরতুবী মাদরাসা টাঙ্গাইলের চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ খান বলেন, এই উদ্ভাবন দেশের জন্য উজ্জ্বল ভূমিকা রাখবে| এই সাফল্য তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের দুয়ারে খুব সহজেই প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে|











